আদি ভারতের ইতিহাসরচনা: বিতর্ক, বিরুদ্ধতা, বিনিময়
রণবীর চক্রবর্তী
এই দীর্ঘ কথোপকথনে অধ্যাপক রণবীর চক্রবর্তী ইতিহাসরচনার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দিক এবং ক্ষেত্রকে ছুঁয়ে গিয়েছেন। গোড়াতেই তিনি কালপর্ব বা রাজবংশের ভিত্তিতে যুগ বিভাজনের বাঁধাধরা ছক ব্যবহারের প্রবণতার বাইরে বেরোনোর কথা বলেছেন। ভারত মহাসাগরের ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি মৌসুমি বায়ুনির্ভর আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সম্পর্কে গভীরে গিয়ে আলোচনা করেছেন এবং স্থলভাগের সমাজ ও উপকূলনির্ভর সম্প্রদায় উভয়ের উপরেই এই ব্যবস্থার বিশেষ সমন্বয়কারী প্রভাবের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, করে বিধি-নিষেধকেন্দ্রিক সংস্কৃত শাস্ত্রে সমাজের উপরতলার অংশগুলির প্রতি পক্ষপাত দেখা গিয়েছে, যার কারণ বর্ণ-জাতি ব্যবস্থা। আর এই ব্যবস্থার প্রভাবের দরুন আদি ভারত বিষয়ক ঐতিহাসিক আখ্যানে সচল ও জটিল সামুদ্রিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত অজস্র গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে বেশিরভাগ সময়েই অবহেলা করা হয়েছে। রাষ্ট্র-সমাজনির্মাণ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ গড়ে উঠেছিল জেএনইউ-তে শিক্ষকতার সময়ে। সেই সূত্রেই তিনি রাজত্ব আর সাম্রাজ্যের সীমারেখা নিয়ে তলিয়ে চর্চা করেছেন। অধ্যাপক চক্রবর্তীর ইতিহাসচর্চার পথ ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে এবং সমাজের নীচুতলার শ্রেণিগুলির সংগঠিত বহিষ্কার, প্রান্তিকীকরণ ও বিচ্ছিন্নকরণের প্রক্রিয়া তাঁর চর্চার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক অনুসন্ধান গড়ে ওঠে বিতর্ক, বিরুদ্ধতা ও আলোচনার মধ্যে থেকে। অতীতের বিভিন্ন জটিলতাকে বোঝা ও তাকে ব্যাখ্যা করার সারাৎসার নিহিত আছে এই সচল প্রক্রিয়াটির মধ্যে। নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণের সন্ধান পাওয়া গেলে তা আমাদের ইতিহাস বিষয়ক বোঝাপড়া আমূল পালটে দিতে পারে, তবে এই ধরনের নতুন সূত্রের সন্ধান নিয়মিত ভিত্তিতে পাওয়া যায় না। তার বদলে প্রতিষ্ঠিত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই নতুন প্রশ্ন গড়ে তোলার কাজ ইতিহাসবিদদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র সন্ধানের পথে টেনে নিয়ে যায়। ‘ধর্ম’-কে ইউরোপীয় অর্থে রিলিজিয়ন-এর সঙ্গে একাসনে বসানোর প্রবণতার তিনি বিরোধিতা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, ইতিহাসরচনার ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারাতেই ধর্মীয় পরিচিতির গুরুত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে। অশোক থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের চোল রাজারা পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের শাসকরা কেউই নির্দিষ্ট একটি ধর্মবিশ্বাসকে সমর্থন করার বা তার বিরোধিতা করার বাঁধাধরা পথ অনুসরণ করেননি। প্রাথমিকভাবে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি ভারতীয় ইতিহাস বিষয়ক যে বিকৃত ধারণা প্রচার করেছিল এবং পরবর্তীকালে অসহিষ্ণুতার প্রচারকরা যার জের টেনে নিয়ে চলেছে, যে-দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মবিশ্বাসভিত্তিক পরিচিতিগুলিকে একমাত্রিক সত্তা হিসেবে তুলে ধরে, অধ্যাপক চক্রবর্তী সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেছেন। ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে সহজাতভাবে নিহিত বহুত্বের ভাবনার উপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক চর্চার লক্ষ্য অতীতকে গৌরবান্বিত করা বা জাতীয় অহমিকাকে উৎসাহ জোগানো নয়। এই চর্চা বর্তমানকে অনুধাবন করার ব্যাখ্যামূলক তরিকা হিসেবে কাজ করে, কারণ অতীতের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই বর্তমানকে তার নির্দিষ্ট গড়ন দেয়।
প্রকাশনা প্রতিক্ষণ [] বাকি তথ্য পেজের নীচে
Conversation with
Ranabir Chakravarti
Publisher
Pratikshan
ISBN
978-93-94205-38-3
Other Details
৪৮ পৃষ্ঠা। পেপারব্যাক।
Category
ইতিহাস, সাক্ষাৎকার
Tag
Ädi Bhärater Itihäsrachanä


















